▲ Studenter från Eden Girls College demonstrerar 4 februari 1952. Bild: Rafiqul Islam
মাতৃভাষার অধিকার আদায়ের লড়াই একটি স্বাধীন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা ও সংগ্রামের সূচনা করে। কালের পরিক্রমায় সেই লড়াইয়ের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে জাতিসংঘ ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করে।
হাজারও মানুষের দীর্ঘ সারি। প্রায় সবাই পরনে শাদাকালো পোশাক। হাতে নানা রঙের ফুল। উচ্চস্বরে বাজছে অমর একুশের গান। আমাদের কণ্ঠেও এই মায়াময় সুর। খালি পায়ে আমরা হেঁটে চলেছি শহিদ মিনারের দিকে। পায়ের নিচে নুড়ি-পাথরের খোঁচা লাগছে। তবু কী এক সম্মোহনে, শ্রদ্ধা মেশানো ঘোরে আমরা এগিয়ে চলেছি। ভিড়ে যদি হারিয়ে যাই, তাই বাবা শক্ত করে হাত ধরে আছে—২১ ফেব্রুয়ারি স্মরণে এলেই শৈশবের এই দৃশ্যগুলো আমার চোখের সামনে ছায়াছবির মতো ভেসে ওঠে। একে আমরা ‘প্রভাতফেরি’ বলি।
প্রভাতফেরি আমাদের নিয়ে যায় ভাষাশহিদদের স্মৃতির মিনারে। প্রভাতফেরি শব্দের আভিধানিক অর্থ প্রভাতে উদ্বোধনী সংগীত গেয়ে জনগণকে জাগানো। একুশে ফেব্রুয়ারি সকালে একুশের গান গেয়ে ফুল দিয়ে ভাষাশহিদদের শ্রদ্ধা জানানোর যাত্রাকে প্রভাতফেরি বলা হয়।
প্রভাতফেরির পরেই দেশাত্মবোধক গান ও নাচের অনুষ্ঠান, নাটক, একুশের কবিতা পাঠ, স্বরচিত কবিতা পাঠ, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, বইমেলাসহ নানা আয়োজন থাকত। আমরা জানুয়ারি থেকেই প্রস্তুতি নিতাম। প্রতি বছরই নতুন কবিতা লেখার চেষ্টা করতাম এই দিনে পড়ব বলে। এখন এসব কেবলই স্মৃতি!
বাংলাদেশি মানুষের কাছে ২১ ফেব্রুয়ারি ‘মহান শহিদ দিবস’। পৃথিবীর মানুষের কাছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। বাঙালির মহান দিবসটি বৈশ্বিক হওয়ার পেছনে রয়েছে সুদীর্ঘ ইতিহাস। কিংবদন্তি গীতিকার ও সুরকার আবদুল লতিফের কালজয়ী দেশাত্মবোধক গান ‘দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা, কারও দানে পাওয়া নয়’ শুনলেই স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়, শোষণ ও বঞ্চনার ইতিহাস কত দীর্ঘ হয়। লাখো বাঙালির বুকের রক্তে পাওয়া আমাদের বাংলা ভাষা, আমাদের ‘বাংলা মা’ বা বাংলাদেশ। কেউ করুণা করে মাতৃভাষায় আমাদের কথা বলার অধিকার দেয়নি। কারও অনুগ্রহে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ পাইনি।
২০০ বছরের ব্রিটিশ শাসনে জর্জরিত ছিল ভারতীয় উপমহাদেশ। সে সময় বলা হতো— ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য কখনও অস্ত যায় না। দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অবশেষে ১৯৪৭ সালে ভারতে তাদের সূর্য অস্ত যায়। কিন্তু আমাদের ভৌগোলিক দেহে রয়ে যায় ‘ধর্মের বিষ’। ব্রিটিশদের তাড়ানোর সাথে সাথে ধর্মের ভিত্তিতে দুটি আলাদা রাষ্ট্রের জন্ম হয়। একে বলা হয় ‘দ্বিজাতি তত্ত্ব’। ভারত হয় হিন্দুর আর পাকিস্তান হয় মুসলমানের। ধর্মীয় রাজনীতির বলি হয় কোটি মানুষ। শুধু ধর্মের কারণে নিজ ভিটেমাটি ছেড়ে পাড়ি জমাতে হয় অন্য ভূমিতে, যেখানে তার নাড়ির সম্পর্ক নেই। দেশভাগের এই বেদনা এখনও মানুষকে পীড়িত করে।
দেশভাগের পর পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটির ভৌগোলিক সীমানা নির্ধারণ ছিল হাস্যকর। মানচিত্রের দিকে তাকালেই টের পাওয়া যায়, ওই দূরে এক টুকরো পশ্চিম পাকিস্তান আর এই দূরে এক টুকরো পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ)। দূরত্বের অঙ্কে যা ১৬০০ কিলোমিটারের বেশি। পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে পূর্ব পাকিস্তানের না ছিল ভাষাগত মিল, না ছিল সংস্কৃতিগত মিল। শুধু ইসলামের ভিত্তিতে দুটি ভূখণ্ডকে অদৃশ্য সুতায় জোড়া লাগানো হয়েছিল। তাতে মানুষের মনের অভিপ্রায় ছিল না। সেই সুতা যে ছিড়বে, তা সকলেরই জানা ছিল।
ইতিহাসবিদেরা ভাষা আন্দোলনকে দুই ভাগে ভাগ করেন। ১৯৪৮ থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত প্রথম পর্যায় আর ১৯৫০ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত দ্বিতীয় পর্যায়, যাকে ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায় বলা হয়। ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরে পলাশী ব্যারাকে উর্দু ভাষার সমর্থক ও বাংলা ভাষার সমর্থকদের সংঘর্ষ বাধলেও ভাষা আন্দোলনের সূচনা মূলত ১৯৪৮ সাল থেকে।
পাকিস্তানের জন্মের পরপরই শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষু বড় হতে থাকে। নিরীহ পূর্ব পাকিস্তানিদের ওপর শুরু হয় নানা মাত্রার নির্যাতন। পাকিস্তানের জাতির জনক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বাঙালির ভাষার অধিকার কেড়ে নিতে চান। সংখ্যাগুরুর ভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও তিনি আমাদের ওপর চাপিয়ে দিতে চান উর্দু ভাষা, ধ্বংস করতে চান বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি। রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুকে চাপিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি বাংলা লিপিকে আরবি হরফে রূপান্তরের একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জিন্নাহ প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন, ‘উর্দু এবং একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’। তার এই ঘোষণার পর বাংলার ছাত্রজনতা প্রতিবাদে ফেটে পড়ে।
১৯৪৮ সালের ২৪ মার্চ জিন্নাহ আবার বলেন, উর্দুই হবে রাষ্ট্রভাষা। এই দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে বিশেষ সমাবর্তনে তিনি ভাষা আন্দোলনকে ভারতের উসকানি হিসেবে উল্লেখ করেন। বলেন, ‘উর্দুই রাষ্ট্রভাষা হবে। …এই ভাষায় ইসলামি সংস্কৃতি ও মুসলিম ঐতিহ্য যত বেশি চর্চা হয়েছে, অন্য কোনও প্রাদেশিক ভাষায় সে রকম হয়নি। এই উর্দু ভাষা অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্রের কথ্য ভাষার সমকক্ষ।’ জিন্নাহর এই ঘোষণা ছাত্ররা বিনা চ্যালেঞ্জে মেনে নেননি। তারা ‘নো নো’ বলে প্রতিবাদ করেছিলেন।
তবে জিন্নাহর (১১ সেপ্টেম্বর ১৯৪৮) মৃত্যুর পর ভাষা আন্দোলনের গতি কিছুটা স্তিমিত হয়ে আসে।
Porträtt av Pranto Palash. Illustration: Madhu Mondol (beskuren)
এখানে আরেকটি ঐতিহাসিক ঘটনার কথা উল্লেখ না করলেই নয়। ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের রাজধানী করাচিতে পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন বসে। গণপরিষদের পূর্ব বাংলার অন্যতম প্রতিনিধি ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ইংরেজি ও উর্দুর সঙ্গে বাংলাকেও গণপরিষদের ব্যবহারিক ভাষা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি তুলে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। কিন্তু তার প্রস্তাবের বিরোধিতা করে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ও পূর্ব বাংলার মন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনসহ একাধিক নেতা মন্তব্য করেন, ‘মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে এবং দেশের সংহতি রক্ষার জন্য পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে মাত্র একটি এবং তা হবে উর্দু।’ এ খবর ঢাকায় পৌঁছালে তীব্র অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে, বিশেষ করে ছাত্রসমাজ এ প্রস্তাব একদমই মেনে নিতে পারেননি। তারা ১১ মার্চ প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন। কিন্তু শুরু হয় পুলিশি নির্যাতন ও গ্রেফতার।
১৯৫০ সালে দেশব্যাপী রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
১৯৫১ সালে ১১ মার্চ পালনের জন্য সারা দেশে প্রচারপত্র বিলি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ভাষাসৈনিক আবদুল মতিনকে আহ্বায়ক করে নতুন করে গঠন করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১১ মার্চ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট ও সভা অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৫০ থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত নতুন রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ভাষা আন্দোলনকে বেগবান করে।
এক স্মৃতিচারণামূলক লেখায় ভাষাসৈনিক আবদুল মতিন বলেছেন, ১৯৫১ সালের ১১ মার্চ পালন উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনে আমতলায় এক ছাত্রসভা চলছিল। সভার এক কোণে বসে তিনি ছাত্রনেতাদের বক্তৃতা শুনছিলেন। কোনও বক্তার বক্তৃতাই তার ভালো লাগছিল না। একপর্যায়ে তিনি দাঁড়িয়ে সভার সভাপতিকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আমি কিছু বলতে চাই।’
পরে বক্তৃতায় আবদুল মতিন বলেন, ‘এভাবে সভা করে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করা যাবে না। আপনারা আজ যা কিছু করছেন আর বলছেন, তা সবই আনুষ্ঠানিকতামাত্র। এতে কোনও কাজ হবে না। যদি বাংলা ভাষার দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করতে চান, তবে রাস্তায় আন্দোলনে নামুন।’ তার এই বক্তব্য বেশ সাড়া ফেলেছিল। পরে সবাই মিলে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবিতে ঢাকায় পতাকা দিবস উদযাপনের কর্মসূচি গ্রহণ করেন।
১৯৫১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি বেশ বড় পরিসরে ১১ মার্চ পালন করে। অবজারভার পত্রিকায় ১২ মার্চ সংখ্যায় এই সংবাদ গুরুত্বসহকারে প্রকাশিত হয়।
ভাষাসৈনিক আবদুল মতিনের লেখা থেকে আরও জানা যায়, ১৯৫১ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ‘স্থানীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি স্থাপন করুন এবং বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করুন’ শিরোনামে একটি প্রচারপত্র প্রকাশ করা হয়। বিশেষ করে ছাত্রদের মধ্যে এটি ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়।
আবদুল মতিন লিখেছেন, ‘২৭ জানুয়ারি, ১৯৫২ সালে নাজিমউদ্দিন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পল্টন ময়দানে এক জনসভায় উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করা হবে বলে ঘোষণা দেন। এর প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি ৩০ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতীকী ধর্মঘট আহ্বান করে। এ ধর্মঘট স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালিত হয়। এদিন ১০-১৫ হাজার লোকের অভূতপূর্ব মিছিল হয়। জনসাধারণ রাস্তায় সমবেত হয়ে সে মিছিল দেখে এবং তাকে অভিনন্দন জানায়। মিছিল শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কলাভবন প্রাঙ্গণে এক বিরাট সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এ সমাবেশে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির পক্ষ থেকে ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালনের আহ্বান জানাই। এ কর্মসূচিও সফলভাবে পালিত হয়।’
২১ ফেব্রুয়ারির মাত্র ২০ দিন আগে, অর্থাৎ ৩০ জানুয়ারি সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ গঠন করা হয়। সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয় ৪ ফেব্রুয়ারি সব প্রতিষ্ঠানে হরতাল পালনের। বাংলার মানুষের মুখে মুখে একটিই স্লোগান ধ্বনিত হয় ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে এক সর্বদলীয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এই সমাবেশে রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, ছাত্র এবং সাংস্কৃতিক কর্মীরা যুক্ত হন।
১১ ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ লেখা পতাকা বিক্রির মাধ্যমে টাকা সংগ্রহ করে পতাকা দিবস পালন করে।
১৯৫২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় সরকার ঘোষণা দেয়, পর দিন অর্থাৎ ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। এদিকে আগেই ঘোষণা করা হয়েছিল ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের হরতাল পালন করা হবে। পাকিস্তান সরকারের ১৪৪ ধারার পরোয়া না করে ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্রজনতা মিছিল বের করে। পুলিশ মিছিলে গুলিবর্ষণ করে। ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে পুলিশের গুলিতে রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার, শফিউরসহ আরও অনেকে শহিদ হন, যা বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা আদায়ে বাধ্য করে।
১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ভাষাশহিদদের স্মৃতির উদ্দেশে কবি মাহবুব-উল-আলম চৌধুরী রচনা করেন ১২০ লাইনের ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ শিরোনামের কবিতা। দীর্ঘ কবিতাটি একুশে ফেব্রুয়ারিতে ভাষার জন্য আত্মত্যাগকারী শহীদদের স্মরণে প্রথম এবং ভাষিক আগ্রাসনের ওপর লিখিত দ্বিতীয় কবিতা হিসেবে ধরা হয়। কবিতাটি চট্টগ্রামে রচিত হয়েছিল এবং ওই দিনই একটি বিশেষ বুলেটিনে তা প্রকাশ পায়। প্রকাশ ও প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে কবিতাটি তৎকালীন সরকার বাজেয়াপ্ত করেছিল।
ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন শিল্পী, চিত্রকর, কবি, সাহিত্যিকসহ সাংস্কৃতিক কর্মীরা। গীতিকবি আবদুল লতিফের ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইরা নিতে চায়’ কবিতাটি এখনও আমাদের বুকে দ্রোহের আগুন জ্বালায়।
অনেকেই বলেন, কবি শামসুদ্দীন আহমদ রচিত ‘ভুলব না ভুলব না, ভুলব না আর একুশে ফেব্রুয়ারি ভুলব না’ গানটি ভাষার জন্য আত্মদানকারী শহিদদের ওপর প্রথম রচিত গান। তবে আবদুল গাফফার চৌধুরী রচিত ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’ গানটি কালের বিবর্তনে সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়। আবদুল গাফফার চৌধুরী রচিত কবিতাটিতে প্রথমে আবদুল লতিফ সুর দিয়েছিলেন। পরে আলতাফ মাহমুদ নতুন করে সুরারোপ করেন। এই কবিতাটি একুশের গান হিসেবে প্রতি একুশের প্রভাতফেরিতে গাওয়া হয়।
২১ ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার আদায়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দিন। পৃথিবীর সব জনগোষ্ঠীরই মাতৃভাষায় মনের ভাব প্রকাশের অধিকার রয়েছে। সবারই মাতৃভাষায় লেখাপড়া করার অধিকার রয়েছে। ভাষা যাতে বিলুপ্ত না হয়, সেদিকে আমাদের গভীর মনোযোগ দিতে হবে।
১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ইউনেসকোর ৩০তম অধিবেশন বসে। ইউনেসকোর সেই সভায় একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণার প্রস্তাব পাস হয়। ফলে পৃথিবীর সব ভাষাভাষীর কাছে একটি উল্লেখযোগ্য দিন হিসেবে একুশে ফেব্রুয়ারি স্বীকৃতি পায়। বিশ্বের দরবারে বাংলা ভাষা লাভ করে বিশেষ মর্যাদা। ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে পৃথিবীর ১৮৮টি দেশে এ দিনটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন শুরু হয়।
ভাষাশহিদদের আত্মত্যাগকে স্মরণ করার জন্য শহিদ মিনার নির্মাণ করা হয়। এর পেছনেও রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। ২১ ফেব্রুয়ারির ছাত্রজনতার মিছিলে গুলির ঘটনার পর ২২ ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা শহিদ মিনার বানানোর সিদ্ধান্ত নেয়। ঢাকায় কারফিউ থাকা সত্ত্বেও ২৩ ফেব্রুয়ারি বিকেলে কাজ শুরু হয়। শহিদ মিনারটি তৈরি করেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা। বদরুল আলম ও সাঈদ হায়দারের নকশায় শুরু করে পুরো রাত কাজ করার পর শহিদ মিনারটি তৈরির কাজ শেষ হয়। এটি ছিল ১০ ফুট উঁচু ও ৬ ফুট চওড়া। পরে পুলিশ শহিদ মিনারটি ভেঙে দেয়।
বর্তমানে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারটি স্থপতি ও শিল্পী হামিদুর রহমানের নকশায় পুনরায় নির্মিত হয়। ১৯৫৭ সালের নভেম্বরে শুরু হওয়া এই নির্মাণযজ্ঞে তার সঙ্গে যোগ দেন বিখ্যাত ভাস্কর নভেরা আহমেদ। এই নকশায় ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, মাতৃভাষার জন্য ত্যাগ এবং ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতীকী রূপ ফুটিয়ে তোলা হয়। ১৯৬৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি শহিদ আবুল বরকতের মা হাসিনা বেগম শহিদ মিনারের বর্তমান কাঠামোটি উদ্বোধন করেন। সেই থেকে শহিদ মিনার বাঙালির আবেগের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র।
বাঙালির লড়াই-সংগ্রামের ইতিহাসে ভাষা আন্দোলন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই ১৯৪৭ সাল থেকে পশ্চিম পাকিস্তান আমাদের মানুষের ওপর যে বর্বরতা চালিয়েছে, তারই ফলশ্রুতিতে বাঙালি চেয়েছে ভাষাতাত্ত্বিক জাতিরাষ্ট্র। দীর্ঘ লড়াই সংগ্রামের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আমরা পাই লাল-সবুজ পতাকা ও একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।
রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার ও শফিউরসহ যারা মাতৃভাষার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন, তারা ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন এবং থাকবেন। আমরা তোমাদের ভুলব না।
Pranto Palash • 2026-03-31 Pranto Palash är journalist och författare. Kommer från Bangladesh och är ICORN-fristadsförfattare i Göteborg.
Rebecca González Léon • 2026-09-02
Minnena bärs av orden, och i förmågan att kunna formulera dem. Rebecca Gonzále León skriver om hur det är det bräckliga språket som upprätthåller bandet till Kuba, och om rädslan att förlora det.
Läs mer →
Emöke Andersson Lipcsey • 2026-06-17
Språket formar hur vi förstår världen och i och med ai-boomen är en handfull teknikföretag på väg att helt dominera vår språkliga och kulturella infrastruktur. Läs Emöke Andersson Lipcseys tredje essä i hennes serie om artificiell intelligens.
Läs mer →
Zanyar Adami • 2026-06-04
Inför nyårsfirandet försöker han återta ett kulturarv som glidit honom ur händerna. Mellan folkdräkt, kärleksord och skuldkänslor berättar Zanyar Adami om exilens tystaste förlust: modersmålet.
Läs mer →
▲ Studenter från Eden Girls College demonstrerar 4 februari 1952. Bild: Rafiqul Islam
মাতৃভাষার অধিকার আদায়ের লড়াই একটি স্বাধীন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা ও সংগ্রামের সূচনা করে। কালের পরিক্রমায় সেই লড়াইয়ের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে জাতিসংঘ ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করে।
হাজারও মানুষের দীর্ঘ সারি। প্রায় সবাই পরনে শাদাকালো পোশাক। হাতে নানা রঙের ফুল। উচ্চস্বরে বাজছে অমর একুশের গান। আমাদের কণ্ঠেও এই মায়াময় সুর। খালি পায়ে আমরা হেঁটে চলেছি শহিদ মিনারের দিকে। পায়ের নিচে নুড়ি-পাথরের খোঁচা লাগছে। তবু কী এক সম্মোহনে, শ্রদ্ধা মেশানো ঘোরে আমরা এগিয়ে চলেছি। ভিড়ে যদি হারিয়ে যাই, তাই বাবা শক্ত করে হাত ধরে আছে—২১ ফেব্রুয়ারি স্মরণে এলেই শৈশবের এই দৃশ্যগুলো আমার চোখের সামনে ছায়াছবির মতো ভেসে ওঠে। একে আমরা ‘প্রভাতফেরি’ বলি।
প্রভাতফেরি আমাদের নিয়ে যায় ভাষাশহিদদের স্মৃতির মিনারে। প্রভাতফেরি শব্দের আভিধানিক অর্থ প্রভাতে উদ্বোধনী সংগীত গেয়ে জনগণকে জাগানো। একুশে ফেব্রুয়ারি সকালে একুশের গান গেয়ে ফুল দিয়ে ভাষাশহিদদের শ্রদ্ধা জানানোর যাত্রাকে প্রভাতফেরি বলা হয়।
প্রভাতফেরির পরেই দেশাত্মবোধক গান ও নাচের অনুষ্ঠান, নাটক, একুশের কবিতা পাঠ, স্বরচিত কবিতা পাঠ, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, বইমেলাসহ নানা আয়োজন থাকত। আমরা জানুয়ারি থেকেই প্রস্তুতি নিতাম। প্রতি বছরই নতুন কবিতা লেখার চেষ্টা করতাম এই দিনে পড়ব বলে। এখন এসব কেবলই স্মৃতি!
বাংলাদেশি মানুষের কাছে ২১ ফেব্রুয়ারি ‘মহান শহিদ দিবস’। পৃথিবীর মানুষের কাছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। বাঙালির মহান দিবসটি বৈশ্বিক হওয়ার পেছনে রয়েছে সুদীর্ঘ ইতিহাস। কিংবদন্তি গীতিকার ও সুরকার আবদুল লতিফের কালজয়ী দেশাত্মবোধক গান ‘দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা, কারও দানে পাওয়া নয়’ শুনলেই স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়, শোষণ ও বঞ্চনার ইতিহাস কত দীর্ঘ হয়। লাখো বাঙালির বুকের রক্তে পাওয়া আমাদের বাংলা ভাষা, আমাদের ‘বাংলা মা’ বা বাংলাদেশ। কেউ করুণা করে মাতৃভাষায় আমাদের কথা বলার অধিকার দেয়নি। কারও অনুগ্রহে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ পাইনি।
২০০ বছরের ব্রিটিশ শাসনে জর্জরিত ছিল ভারতীয় উপমহাদেশ। সে সময় বলা হতো— ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য কখনও অস্ত যায় না। দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অবশেষে ১৯৪৭ সালে ভারতে তাদের সূর্য অস্ত যায়। কিন্তু আমাদের ভৌগোলিক দেহে রয়ে যায় ‘ধর্মের বিষ’। ব্রিটিশদের তাড়ানোর সাথে সাথে ধর্মের ভিত্তিতে দুটি আলাদা রাষ্ট্রের জন্ম হয়। একে বলা হয় ‘দ্বিজাতি তত্ত্ব’। ভারত হয় হিন্দুর আর পাকিস্তান হয় মুসলমানের। ধর্মীয় রাজনীতির বলি হয় কোটি মানুষ। শুধু ধর্মের কারণে নিজ ভিটেমাটি ছেড়ে পাড়ি জমাতে হয় অন্য ভূমিতে, যেখানে তার নাড়ির সম্পর্ক নেই। দেশভাগের এই বেদনা এখনও মানুষকে পীড়িত করে।
দেশভাগের পর পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটির ভৌগোলিক সীমানা নির্ধারণ ছিল হাস্যকর। মানচিত্রের দিকে তাকালেই টের পাওয়া যায়, ওই দূরে এক টুকরো পশ্চিম পাকিস্তান আর এই দূরে এক টুকরো পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ)। দূরত্বের অঙ্কে যা ১৬০০ কিলোমিটারের বেশি। পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে পূর্ব পাকিস্তানের না ছিল ভাষাগত মিল, না ছিল সংস্কৃতিগত মিল। শুধু ইসলামের ভিত্তিতে দুটি ভূখণ্ডকে অদৃশ্য সুতায় জোড়া লাগানো হয়েছিল। তাতে মানুষের মনের অভিপ্রায় ছিল না। সেই সুতা যে ছিড়বে, তা সকলেরই জানা ছিল।
ইতিহাসবিদেরা ভাষা আন্দোলনকে দুই ভাগে ভাগ করেন। ১৯৪৮ থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত প্রথম পর্যায় আর ১৯৫০ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত দ্বিতীয় পর্যায়, যাকে ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায় বলা হয়। ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরে পলাশী ব্যারাকে উর্দু ভাষার সমর্থক ও বাংলা ভাষার সমর্থকদের সংঘর্ষ বাধলেও ভাষা আন্দোলনের সূচনা মূলত ১৯৪৮ সাল থেকে।
পাকিস্তানের জন্মের পরপরই শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষু বড় হতে থাকে। নিরীহ পূর্ব পাকিস্তানিদের ওপর শুরু হয় নানা মাত্রার নির্যাতন। পাকিস্তানের জাতির জনক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বাঙালির ভাষার অধিকার কেড়ে নিতে চান। সংখ্যাগুরুর ভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও তিনি আমাদের ওপর চাপিয়ে দিতে চান উর্দু ভাষা, ধ্বংস করতে চান বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি। রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুকে চাপিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি বাংলা লিপিকে আরবি হরফে রূপান্তরের একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জিন্নাহ প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন, ‘উর্দু এবং একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’। তার এই ঘোষণার পর বাংলার ছাত্রজনতা প্রতিবাদে ফেটে পড়ে।
১৯৪৮ সালের ২৪ মার্চ জিন্নাহ আবার বলেন, উর্দুই হবে রাষ্ট্রভাষা। এই দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে বিশেষ সমাবর্তনে তিনি ভাষা আন্দোলনকে ভারতের উসকানি হিসেবে উল্লেখ করেন। বলেন, ‘উর্দুই রাষ্ট্রভাষা হবে। …এই ভাষায় ইসলামি সংস্কৃতি ও মুসলিম ঐতিহ্য যত বেশি চর্চা হয়েছে, অন্য কোনও প্রাদেশিক ভাষায় সে রকম হয়নি। এই উর্দু ভাষা অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্রের কথ্য ভাষার সমকক্ষ।’ জিন্নাহর এই ঘোষণা ছাত্ররা বিনা চ্যালেঞ্জে মেনে নেননি। তারা ‘নো নো’ বলে প্রতিবাদ করেছিলেন।
তবে জিন্নাহর (১১ সেপ্টেম্বর ১৯৪৮) মৃত্যুর পর ভাষা আন্দোলনের গতি কিছুটা স্তিমিত হয়ে আসে।
Porträtt av Pranto Palash. Illustration: Madhu Mondol (beskuren)
এখানে আরেকটি ঐতিহাসিক ঘটনার কথা উল্লেখ না করলেই নয়। ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের রাজধানী করাচিতে পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন বসে। গণপরিষদের পূর্ব বাংলার অন্যতম প্রতিনিধি ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ইংরেজি ও উর্দুর সঙ্গে বাংলাকেও গণপরিষদের ব্যবহারিক ভাষা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি তুলে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। কিন্তু তার প্রস্তাবের বিরোধিতা করে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ও পূর্ব বাংলার মন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনসহ একাধিক নেতা মন্তব্য করেন, ‘মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে এবং দেশের সংহতি রক্ষার জন্য পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে মাত্র একটি এবং তা হবে উর্দু।’ এ খবর ঢাকায় পৌঁছালে তীব্র অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে, বিশেষ করে ছাত্রসমাজ এ প্রস্তাব একদমই মেনে নিতে পারেননি। তারা ১১ মার্চ প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন। কিন্তু শুরু হয় পুলিশি নির্যাতন ও গ্রেফতার।
১৯৫০ সালে দেশব্যাপী রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
১৯৫১ সালে ১১ মার্চ পালনের জন্য সারা দেশে প্রচারপত্র বিলি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ভাষাসৈনিক আবদুল মতিনকে আহ্বায়ক করে নতুন করে গঠন করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ। বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১১ মার্চ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট ও সভা অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৫০ থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত নতুন রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ভাষা আন্দোলনকে বেগবান করে।
এক স্মৃতিচারণামূলক লেখায় ভাষাসৈনিক আবদুল মতিন বলেছেন, ১৯৫১ সালের ১১ মার্চ পালন উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনে আমতলায় এক ছাত্রসভা চলছিল। সভার এক কোণে বসে তিনি ছাত্রনেতাদের বক্তৃতা শুনছিলেন। কোনও বক্তার বক্তৃতাই তার ভালো লাগছিল না। একপর্যায়ে তিনি দাঁড়িয়ে সভার সভাপতিকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আমি কিছু বলতে চাই।’
পরে বক্তৃতায় আবদুল মতিন বলেন, ‘এভাবে সভা করে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করা যাবে না। আপনারা আজ যা কিছু করছেন আর বলছেন, তা সবই আনুষ্ঠানিকতামাত্র। এতে কোনও কাজ হবে না। যদি বাংলা ভাষার দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করতে চান, তবে রাস্তায় আন্দোলনে নামুন।’ তার এই বক্তব্য বেশ সাড়া ফেলেছিল। পরে সবাই মিলে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবিতে ঢাকায় পতাকা দিবস উদযাপনের কর্মসূচি গ্রহণ করেন।
১৯৫১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি বেশ বড় পরিসরে ১১ মার্চ পালন করে। অবজারভার পত্রিকায় ১২ মার্চ সংখ্যায় এই সংবাদ গুরুত্বসহকারে প্রকাশিত হয়।
ভাষাসৈনিক আবদুল মতিনের লেখা থেকে আরও জানা যায়, ১৯৫১ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ‘স্থানীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি স্থাপন করুন এবং বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করুন’ শিরোনামে একটি প্রচারপত্র প্রকাশ করা হয়। বিশেষ করে ছাত্রদের মধ্যে এটি ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়।
আবদুল মতিন লিখেছেন, ‘২৭ জানুয়ারি, ১৯৫২ সালে নাজিমউদ্দিন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পল্টন ময়দানে এক জনসভায় উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করা হবে বলে ঘোষণা দেন। এর প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি ৩০ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতীকী ধর্মঘট আহ্বান করে। এ ধর্মঘট স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালিত হয়। এদিন ১০-১৫ হাজার লোকের অভূতপূর্ব মিছিল হয়। জনসাধারণ রাস্তায় সমবেত হয়ে সে মিছিল দেখে এবং তাকে অভিনন্দন জানায়। মিছিল শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কলাভবন প্রাঙ্গণে এক বিরাট সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এ সমাবেশে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির পক্ষ থেকে ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকার সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালনের আহ্বান জানাই। এ কর্মসূচিও সফলভাবে পালিত হয়।’
২১ ফেব্রুয়ারির মাত্র ২০ দিন আগে, অর্থাৎ ৩০ জানুয়ারি সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ গঠন করা হয়। সভায় সিদ্ধান্ত নেয়া হয় ৪ ফেব্রুয়ারি সব প্রতিষ্ঠানে হরতাল পালনের। বাংলার মানুষের মুখে মুখে একটিই স্লোগান ধ্বনিত হয় ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে এক সর্বদলীয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এই সমাবেশে রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, ছাত্র এবং সাংস্কৃতিক কর্মীরা যুক্ত হন।
১১ ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ লেখা পতাকা বিক্রির মাধ্যমে টাকা সংগ্রহ করে পতাকা দিবস পালন করে।
১৯৫২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় সরকার ঘোষণা দেয়, পর দিন অর্থাৎ ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। এদিকে আগেই ঘোষণা করা হয়েছিল ২১ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের হরতাল পালন করা হবে। পাকিস্তান সরকারের ১৪৪ ধারার পরোয়া না করে ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্রজনতা মিছিল বের করে। পুলিশ মিছিলে গুলিবর্ষণ করে। ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে পুলিশের গুলিতে রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার, শফিউরসহ আরও অনেকে শহিদ হন, যা বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা আদায়ে বাধ্য করে।
১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ভাষাশহিদদের স্মৃতির উদ্দেশে কবি মাহবুব-উল-আলম চৌধুরী রচনা করেন ১২০ লাইনের ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ শিরোনামের কবিতা। দীর্ঘ কবিতাটি একুশে ফেব্রুয়ারিতে ভাষার জন্য আত্মত্যাগকারী শহীদদের স্মরণে প্রথম এবং ভাষিক আগ্রাসনের ওপর লিখিত দ্বিতীয় কবিতা হিসেবে ধরা হয়। কবিতাটি চট্টগ্রামে রচিত হয়েছিল এবং ওই দিনই একটি বিশেষ বুলেটিনে তা প্রকাশ পায়। প্রকাশ ও প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে কবিতাটি তৎকালীন সরকার বাজেয়াপ্ত করেছিল।
ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন শিল্পী, চিত্রকর, কবি, সাহিত্যিকসহ সাংস্কৃতিক কর্মীরা। গীতিকবি আবদুল লতিফের ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইরা নিতে চায়’ কবিতাটি এখনও আমাদের বুকে দ্রোহের আগুন জ্বালায়।
অনেকেই বলেন, কবি শামসুদ্দীন আহমদ রচিত ‘ভুলব না ভুলব না, ভুলব না আর একুশে ফেব্রুয়ারি ভুলব না’ গানটি ভাষার জন্য আত্মদানকারী শহিদদের ওপর প্রথম রচিত গান। তবে আবদুল গাফফার চৌধুরী রচিত ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’ গানটি কালের বিবর্তনে সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়। আবদুল গাফফার চৌধুরী রচিত কবিতাটিতে প্রথমে আবদুল লতিফ সুর দিয়েছিলেন। পরে আলতাফ মাহমুদ নতুন করে সুরারোপ করেন। এই কবিতাটি একুশের গান হিসেবে প্রতি একুশের প্রভাতফেরিতে গাওয়া হয়।
২১ ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকার আদায়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দিন। পৃথিবীর সব জনগোষ্ঠীরই মাতৃভাষায় মনের ভাব প্রকাশের অধিকার রয়েছে। সবারই মাতৃভাষায় লেখাপড়া করার অধিকার রয়েছে। ভাষা যাতে বিলুপ্ত না হয়, সেদিকে আমাদের গভীর মনোযোগ দিতে হবে।
১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ইউনেসকোর ৩০তম অধিবেশন বসে। ইউনেসকোর সেই সভায় একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণার প্রস্তাব পাস হয়। ফলে পৃথিবীর সব ভাষাভাষীর কাছে একটি উল্লেখযোগ্য দিন হিসেবে একুশে ফেব্রুয়ারি স্বীকৃতি পায়। বিশ্বের দরবারে বাংলা ভাষা লাভ করে বিশেষ মর্যাদা। ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে পৃথিবীর ১৮৮টি দেশে এ দিনটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন শুরু হয়।
ভাষাশহিদদের আত্মত্যাগকে স্মরণ করার জন্য শহিদ মিনার নির্মাণ করা হয়। এর পেছনেও রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। ২১ ফেব্রুয়ারির ছাত্রজনতার মিছিলে গুলির ঘটনার পর ২২ ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা শহিদ মিনার বানানোর সিদ্ধান্ত নেয়। ঢাকায় কারফিউ থাকা সত্ত্বেও ২৩ ফেব্রুয়ারি বিকেলে কাজ শুরু হয়। শহিদ মিনারটি তৈরি করেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা। বদরুল আলম ও সাঈদ হায়দারের নকশায় শুরু করে পুরো রাত কাজ করার পর শহিদ মিনারটি তৈরির কাজ শেষ হয়। এটি ছিল ১০ ফুট উঁচু ও ৬ ফুট চওড়া। পরে পুলিশ শহিদ মিনারটি ভেঙে দেয়।
বর্তমানে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারটি স্থপতি ও শিল্পী হামিদুর রহমানের নকশায় পুনরায় নির্মিত হয়। ১৯৫৭ সালের নভেম্বরে শুরু হওয়া এই নির্মাণযজ্ঞে তার সঙ্গে যোগ দেন বিখ্যাত ভাস্কর নভেরা আহমেদ। এই নকশায় ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, মাতৃভাষার জন্য ত্যাগ এবং ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতীকী রূপ ফুটিয়ে তোলা হয়। ১৯৬৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি শহিদ আবুল বরকতের মা হাসিনা বেগম শহিদ মিনারের বর্তমান কাঠামোটি উদ্বোধন করেন। সেই থেকে শহিদ মিনার বাঙালির আবেগের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র।
বাঙালির লড়াই-সংগ্রামের ইতিহাসে ভাষা আন্দোলন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই ১৯৪৭ সাল থেকে পশ্চিম পাকিস্তান আমাদের মানুষের ওপর যে বর্বরতা চালিয়েছে, তারই ফলশ্রুতিতে বাঙালি চেয়েছে ভাষাতাত্ত্বিক জাতিরাষ্ট্র। দীর্ঘ লড়াই সংগ্রামের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আমরা পাই লাল-সবুজ পতাকা ও একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।
রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার ও শফিউরসহ যারা মাতৃভাষার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন, তারা ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন এবং থাকবেন। আমরা তোমাদের ভুলব না।
Pranto Palash • 2026-03-31 Pranto Palash är journalist och författare. Kommer från Bangladesh och är ICORN-fristadsförfattare i Göteborg.
Rebecca González Léon • 2026-09-02
Minnena bärs av orden, och i förmågan att kunna formulera dem. Rebecca Gonzále León skriver om hur det är det bräckliga språket som upprätthåller bandet till Kuba, och om rädslan att förlora det.
Läs mer →
Emöke Andersson Lipcsey • 2026-06-17
Språket formar hur vi förstår världen och i och med ai-boomen är en handfull teknikföretag på väg att helt dominera vår språkliga och kulturella infrastruktur. Läs Emöke Andersson Lipcseys tredje essä i hennes serie om artificiell intelligens.
Läs mer →
Zanyar Adami • 2026-06-04
Inför nyårsfirandet försöker han återta ett kulturarv som glidit honom ur händerna. Mellan folkdräkt, kärleksord och skuldkänslor berättar Zanyar Adami om exilens tystaste förlust: modersmålet.
Läs mer →